
মালয়েশিয়ায় মাটি কাটার কাজ করতে গিয়ে মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার যুবক শরিফুল ফকির (৩৫)। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই যুবক চার বছর আগে জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। স্বজনদের বলেছিলেন, আগামী কুরবানির ঈদে দেশে ফিরবেন, এরপর বিয়ে করবেন। তাকে ঘিরে পরিবারেও চলছিল নানা প্রস্তুতি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মালয়েশিয়ায় মাটি কাটার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরে স্বজনদের কাছে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বর্ণি গ্রামের বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া।
শরিফুল ফকির টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নের বর্ণি গ্রামের নজরুল ফকিরের ছেলে। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো। তার মেজ ভাই আশরাফুল প্রায় সাত বছর আগে মারা যান। বড় ভাই শারীরিকভাবে অসুস্থ ও ছোট ভাই বাড়িতে গরু-বাছুর দেখাশোনা করেন। ফলে পরিবারের ভরণপোষণের বড় দায়িত্বই ছিল শরিফুলের ওপর।
প্রায় চার বছর আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর নিজের খরচ বাদ দিয়ে নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতেন শরিফুল। স্বজনদের ভাষ্য, প্রতি মাসে তিনি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পরিবারের জন্য পাঠাতেন। তার উপার্জনেই কোনোভাবে চলছিল সংসার।
পরিবার জানায়, সম্প্রতি দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন শরিফুল। কুরবানির ঈদে বাড়িতে এসে বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল তার। সেই কারণে ঘরবাড়ি গোছানোর কাজও শুরু করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
শরিফুলের ফুফু বিলকিস বেগম বলেন, মৃত্যুর আগের রাতেও তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তখন শরিফুল জানিয়েছিলেন, কুরবানির ঈদে দেশে ফিরবেন এবং বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে বলেছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালেই তার মৃত্যুর খবর পান তারা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলকিস বেগম বলেন, ‘ছেলেটা খুব হাসিখুশি ছিল। সবাইকে সম্মান করে কথা বলত। আগের রাতেও বলেছিল, ফুফু, ঈদে বাড়ি আসব, ভালো একটা ঘর করে বিয়ে করব। তাকে বলেছিলাম, তুই দেশে আয়, তারপর তোকে নিয়ে মেয়ে দেখতে যাব। কিন্তু সকালে শুনলাম শরিফুল আর নেই।’
নিহতের বাবা নজরুল ফকির বলেন, শরিফুলই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার পাঠানো টাকাতেই সংসারের খরচ চলত। মালয়েশিয়ায় একটি ড্রেন নির্মাণের জন্য মাটি কাটার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, ‘ড্রেনের দুই পাশে মাটি তুলে রাখা ছিল। শরিফুল ড্রেনের ভেতরে নামার পর হঠাৎ সেই মাটি ধসে তার ওপর পড়ে। অন্যরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তার আগেই সে মারা যায়। আমার ছেলেকে দ্রুত দেশে এনে দিন। শেষবারের মতো ছেলের মুখটা দেখতে চাই।’
শরিফুলের ছোট ভাই শিপুল ফকির বলেন, পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার অনেক স্বপ্ন ছিল তার ভাইয়ের। ঘরবাড়ি ঠিকঠাক করার পাশাপাশি বিয়ের পরিকল্পনাও করেছিলেন। রোববার ফোনে কথা বলার সময়ও ঈদে দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন শরিফুল।
শিপুল বলেন, ‘ভাইয়া বলেছিল ঈদে সবার সঙ্গে বাড়িতে ঈদ করবে। এরপর বিয়ে করবে। আমাদের মেয়েও দেখতে বলেছিল। কিন্তু তার কোনো স্বপ্নই পূরণ হলো না। আমরা শুধু ভাইয়ের মরদেহটা দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে চাই।’
বর্ণি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর কবির জানান, শরিফুলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়া) আসনের এমপি এসএম জিলানীকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।